দাস কোচিং-এর ৫ বছরের পথ চলা—একটি স্বপ্নের বিবর্তন
সূচনা: একটি পুরনো শখ এবং নতুন স্বপ্নের বীজ
মানুষের জীবনের বড় বড় সাফল্যের পেছনে প্রায়ই লুকিয়ে থাকে ছোটবেলার কোনো এক সুপ্ত বাসনা। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সালটা ২০১০-১১, যখন আমি কলেজ পড়ুয়া। তখন থেকেই সংবাদপত্রের কলামে নিজের লেখা দেখার একটা তীব্র আকুলতা আমার ছিল। কয়েকবার লিখে পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখার সেই স্বপ্ন তখন পূরণ হয়নি। সেই ব্যর্থতাই হয়তো মনের ভেতরে একটি জেদ তৈরি করে দিয়েছিল—”যদি অন্য কেউ জায়গা না দেয়, তবে আমার নিজের একটি পত্রিকা থাকবে।”
২০১২ সালে প্রথম কম্পিউটার কেনা ছিল আমার জীবনের এক মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। তখন থেকেই আমি ‘ব্লগিং’ বা অনলাইনে লেখালেখির দুনিয়া সম্পর্কে জানতে পারি। ইন্টারনেটের অসীম সম্ভাবনা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। ২০১৩-১৪ সালের দিকে আমি ‘edutionary.in’ নামে আমার প্রথম শিক্ষামূলক ব্লগ শুরু করি। সেখানে যখন দেখলাম মানুষ আমার লেখা পড়ছে, ভিউ বাড়ছে—তখনই আমি বুঝতে পারলাম, শিক্ষা নিয়ে কাজ করার মধ্যেই আমার সার্থকতা।
বি.এড শিক্ষার্থীদের সংকট এবং ‘দাস কোচিং’-এর ভাবনা
আমার চিন্তা-ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করে যখন আমি ২০১৫ সালে একটি বেসরকারি বি.এড (B.Ed) কলেজে কর্মরত হই। সেখানে শিক্ষার্থীদের খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়। আমি লক্ষ্য করলাম, বি.এড পাঠ্যক্রমের সঠিক গাইডলাইন, সাজানো স্টাডি মেটেরিয়াল, প্র্যাক্টিকাম সলভ এবং বিগত বছরের প্রশ্নের উত্তরের জন্য ছাত্রছাত্রীরা চরম হাহাকার করছে। বাজারে প্রচলিত বই থাকলেও তা সব সময় পর্যাপ্ত ছিল না।
২০১৭-১৮ সালের দিকে আমি আমার পুরনো ব্লগে কিছু বি.এড মেটেরিয়াল শেয়ার করা শুরু করি। কিন্তু তখনো কোনো সঠিক রোডম্যাপ বা ‘ব্র্যান্ড’ তৈরির পরিকল্পনা ছিল না। ২০২০ সালে যখন গোটা পৃথিবী করোনায় স্তব্ধ হয়ে গেল, সেই সময় লকডাউনের দিনগুলোতে আমি লক্ষ্য করলাম ডিজিটাল লার্নিং-এর চাহিদা আকাশছোঁয়া। ঠিক তখনই আমি স্থির করলাম, বিচ্ছিন্নভাবে নয়, এবার একটি সুনির্দিষ্ট নামে বি.এড শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াবো।
১৫ই এপ্রিল ২০২০: দাস কোচিং-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা
পহেলা বৈশাখের পবিত্র দিনে, ১৫ই এপ্রিল ২০২০ তারিখে জন্ম নিল ‘www.dascoaching.blogger.com’। এটি ছিল আমাদের প্রাথমিক ঠিকানা। এরপর ২২শে অক্টোবর ২০২০ তারিখে আমরা আমাদের নিজস্ব ডোমেইন ‘www.dascoaching.in’ রেজিস্টার করি।
শুরুতে কিছু ভুল পথেও আমি হেঁটেছিলাম। শিক্ষার্থীদের সাহায্য করার তাড়নায় কিছু বইয়ের ই-বুক সংস্করণ বিনামূল্যে শেয়ার করতাম, যা নৈতিকভাবে ঠিক ছিল না। কিন্তু ২০২২ সালের মার্চ মাসে যখন নামী প্রকাশনী সংস্থার কর্ণধার আমার সাথে যোগাযোগ করেন এবং অত্যন্ত মার্জিতভাবে কপিরাইট ও ডিজিটাল প্রকাশনার বিষয়টি আমাকে বোঝান, সেদিনই আমি সিদ্ধান্ত নিই—আর কোনো কপি করা কন্টেন্ট নয়। যা হবে নিজের মেধা আর পরিশ্রমে গড়া। সেদিন থেকেই ‘দাস কোচিং’ একটি সৎ এবং মৌলিক ব্র্যান্ড হিসেবে নিজের জয়যাত্রা শুরু করে।
ব্লগার থেকে ওয়ার্ডপ্রেস: এক কঠিন বিপর্যয় ও ঘুরে দাঁড়ানো
আমাদের পথ চলা সব সময় মসৃণ ছিল না। ২০২৩ সালের নভেম্বরে এক ভয়াবহ টেকনিক্যাল বিপর্যয়ের মুখে পড়ি। হঠাৎ আমাদের ব্লগার সাইটটি কাজ করা বন্ধ করে দেয়। কয়েক বছরের পরিশ্রমের ফসল চোখের সামনে হারিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু হাল ছেড়ে দেওয়া আমার স্বভাবে নেই।
১০ই ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে আমরা ওয়ার্ডপ্রেস (WordPress) প্ল্যাটফর্মে আমাদের নতুন ওয়েবসাইট লঞ্চ করি। এটি ছিল শূন্য থেকে আবার শুরু করা। কিন্তু এবার আমাদের অভিজ্ঞতা ছিল বেশি। আমরা সম্পূর্ণ সিস্টেম পরিবর্তন করলাম এবং সাব-ডোমেনের মাধ্যমে বি.এডের জন্য আলাদা ডেডিকেটেড সেকশন তৈরি করলাম। আজ সেই নতুন প্ল্যাটফর্মটিও ২ বছর পূর্ণ করতে চলেছে।
প্রযুক্তির মেলবন্ধন: ২০২৬ সালে এআই এবং আধুনিকায়ন
সময়ের সাথে তাল মেলাতে আমরা সব সময় প্রস্তুত। ২০২৪ সাল থেকে আমরা আমাদের স্টাডি মেটেরিয়াল এবং কন্টেন্ট তৈরিতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা AI টুলের ব্যবহার শুরু করেছি। ২০২৫-২৬ সালের মধ্যে আমরা সেই প্রযুক্তিগুলোকে আয়ত্তে এনেছি। বর্তমানে আমাদের ই-বুক কভার, পিপিটি স্লাইড এবং ডিজিটাল লেসন ডিজাইনগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া থাকে, যা শিক্ষার্থীদের পড়ার অভিজ্ঞতাকে আরও উন্নত করে তোলে।
সাফল্য এবং টিম ‘স্বামী-স্ত্রী’
আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন দেখি শুধু পশ্চিমবঙ্গের নয়, বাংলার বাইরে থেকেও অগণিত শিক্ষার্থী আমাদের সাথে যুক্ত হয়েছেন। অনেক বি.এড কলেজের অধ্যক্ষরা আমাকে ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে শুভকামনা জানিয়েছেন। বর্তমানে ‘দাস কোচিং’ কোনো বিশাল কর্পোরেট টিম নয়। এটি একটি ছোট্ট সংসার। আমার সবচেয়ে বড় শক্তি আমার স্ত্রী। টিমের সদস্য বলতে আমরা বর্তমানে স্বামী-স্ত্রী মিলেই এই বিশাল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করি। তার সাহায্য ছাড়া এই পাহাড়সম কাজ সামলানো হয়তো আমার পক্ষে সম্ভব হতো না। তবে ভবিষ্যতে একটি বড় এবং দক্ষ টিম তৈরির স্বপ্ন আমাদের রয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: বাংলার EdTech বিপ্লব
৫ বছর পূর্ণ করা আমাদের জন্য কেবল একটি শুরু। আগামী ৫ বছরে আমাদের পরিকল্পনা আরও বিশাল:
- সরকারি চাকরির কোচিং: বি.এডের পাশাপাশি TET, SSC এবং অন্যান্য কম্পিটিটিভ পরীক্ষার অনলাইন কোচিং শুরু করা।
- অনলাইন মক টেস্ট: শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হাই-টেক মক টেস্ট পোর্টাল চালু করা।
- ভিডিও কোর্স: লাইভ এবং রেকর্ডেড ক্লাসের মাধ্যমে প্রতিটি বিষয়ের গভীর ব্যাখ্যা দেওয়া।
- মোবাইল অ্যাপ: দাস কোচিং-এর নিজস্ব মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে আসা।
আমাদের লক্ষ্য হলো আগামী ৫ বছরের মধ্যে ‘দাস কোচিং’-কে পশ্চিমবঙ্গের একটি অন্যতম সেরা EdTech Company হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
উপসংহার: কৃতজ্ঞতা ও অঙ্গীকার
আমরা মানুষ, তাই আমাদের কাজে কিছু ভুলভ্রান্তি থাকতেই পারে। কন্টেন্ট আ পডেট বা টেকনিক্যাল সাপোর্টে আমরা আরও উন্নত হওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু আপনাদের ভালোবাসা আর বিশ্বাস আমাদের সব বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সাহস যোগায়। ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার এই মাহেন্দ্রক্ষণে আপনাদের সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা। আপনারা আছেন বলেই ‘দাস কোচিং‘ আছে। এই নতুন বছরে, নতুন সংকল্প নিয়ে আমরা আপনাদের পাশে থাকবো—সব সময়।
সবাইকে জানাই বাংলা শুভ নববর্ষের অনেক অনেক অভিনন্দন! ও শুভেচ্ছা।
সৌমেন দাস
ডিরেক্টর, দাস কোচিং
আপনার শেখার সঙ্গী, আপনার উন্নতির দিশারী।


